বাংলাদেশের লোকশিল্পের ভুবন অনেক বিস্তৃত। আলপনা, নকশিপিঠা, নকশিসাঁচ, নকশিপাখা, শীতল পাটি, নকশিকাঁথা, নকশিশিকা, লোকচিত্র, খেলনা, পুতুল, শোলার কাজ, বাঁশ-বেতের বেড়া, লোক-অলঙ্কার, লোকবাদ্যযন্ত্র, পোড়ামাটির ফলকচিত্র প্রভৃতি নিয়ে বাংলাদেশের লোকশিল্পের বিচিত্র জগৎ।
বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবে বিভিন্নরকম লোকচিত্র তৈরি করা হয়। এর মধ্যে আছে মহররম সম্পর্কিত চিত্র, পটচিত্র, ঘটচিত্র, সরাচিত্র, দেয়ালচিত্র, মুখোশচিত্র, পিড়িচিত্র ইত্যাদি। এ সমস্ত লোকচিত্র আমাদের লোকশিল্পের অংশ। বাংলাদেশের এসব বৈচিত্র্যপূর্ণ লোকশিল্পগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটি সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।
আলপনা
আলপনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লোকশিল্প। বাঙালির বিভিন্ন উৎসবে আলপনা আঁকা হয়। এখন নববর্ষের অনুষ্ঠান, জন্মদিন, বিয়ে, গায়ে হলুদ এবং ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ মিনারঞ্ছল ও সড়কে আমরা আলপনার ব্যবহার দেখতে পাই। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উৎসবের সৌন্দর্য ও জাঁকজমক বাড়িয়ে দিতে আমরা আলপনার ব্যবহার করি। যে কোনো শুভকাজে আলপনা আঁকা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য ও অনেক প্রাচীন একটি রীতি। এর উদ্ভব হয়েছিল মূলত প্রাচীন বাঙালি লোকজীবনের ধর্ম ও জাদু বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন প্রকার পূজা ও ব্রত অনুষ্ঠানে আলপনা আঁকা হতো। যেমন লক্ষ্মীপূজায় গোলাকার আকৃতির আলপনা দেবীর আসন বা বেদী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আলপনায় বহুল ব্যবহৃত একটি মোটিফ হচ্ছে কল্কি। কল্কি এখানে লক্ষ্মীর ধনভাণ্ডারের ধানে ভর্তি প্রতীক চিহ্ন। এই প্রতীক বা রূপক চিহ্ন দিয়ে আলপনা এঁকে লক্ষ্মীদেবীর পূজা করলে সংসারে সমৃদ্ধি আসবে। ধানে গোলা পরিপূর্ণ থাকবে। এই বিশ্বাস থেকে এমন আলপনা আঁকা হতো।

অন্যদিকে আমরা সাংসারিক ও সামাজিক জীবনে যা পাবার আশা করি বা চেষ্টা করি সে আশা পূরণের জন্য করা হতো ব্রতের অনুষ্ঠান। এই ব্রতের অনুষ্ঠানে ও আলপনা আঁকা হতো। ব্রতের আলপনায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মোটিফগুলো ছিল মনের কামনার এক একটি প্রতীক। পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে আলপনা বাঙালির সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের শুভ অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে ওঠে। এখন বিভিন্ন লোকজ মোটিফ যেমন-ফুল, পাতা, মাছ, পাখি ইত্যাদি এবং নানা রকম জ্যামিতিক ও প্রাকৃতিক আকৃতির ব্যবহার করে আলপনা আঁকা হয়। পানিতে চালের গুঁড়া মিশিয়ে পিঠালি তৈরি করে তাতে ন্যাকড়া ভিজিয়ে উঠানে, ঘরের বারান্দায় ও মেঝেতে আলপনা আঁকা হয়। চালের গুঁড়া ছিটিয়ে তার ওপর আঙ্গুল দিয়ে আলপনা আঁকার একটি প্রাচীন রীতি ছিল। ডালের গুঁড়া, পোড়া তুষ, ইটের গুঁড়া প্রভৃতি দিয়ে আলপনায় রঙের বৈচিত্র্য আনা হতো। গতানুগতিকতা ও বাঁধাধরা কিছু আকার-আকৃতি আলপনার একটি বিশেষ দিক হিসেবে গণ্য হতো। এই বাঁধাধরা আকার-আকৃতি বা নকশাকে মোটিফ বলে। তবে আধুনিককালে আলপনা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ও পরিধি বৃদ্ধির সাথে সাথে এর আঙ্গিক ও মোটিফের ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। রঙের ব্যবহারে এসেছে বৈচিত্র্য। এখন প্লাস্টিক রং ও বিভিন্ন রঙের অক্সাইড এর সাথে আইকা গাম মিশিয়ে তুলি দিয়ে আলপনা করা হয়।
সরাচিত্র
চিত্রিত বিভিন্ন প্রকার সরা লোকশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। পাতিলের ঢাকনার নাম সরা। রান্নাঘরের কাজে ব্যবহৃত এ রকম সরা চিত্রিত হয় না। তবে এ ধরনের সরাচিত্র আঁকা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে অনুষ্ঠানের উপকরণ হিসেবে। সরাতে সাধারণত পদ্ম, প্রজাপতি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য চিত্র আঁকা হয়। তবে সরাচিত্রের সব থেকে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে লক্ষ্মীসরা। লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মীসরা প্রধান উপকরণ। পূজার শেষে তা গৃহসজ্জার জন্য ঘরে রাখা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রকমের লক্ষ্মীসরা দেখা যায়। লক্ষ্মীসরাতে দেবী দুর্গার ছবির সাথে লক্ষ্মীর ছবি থাকে। সাথে লক্ষ্মী দেবীর বাহন পেঁচার ছবিও থাকে। লোকজ রীতিতে উজ্জ্বল বিভিন্ন রং দিয়ে এসব ছবি আঁকা হয়। বর্তমানে সরাচিত্র আর শুধু ধর্মীয় বিষয়ে আবদ্ধ নয়। এখন বিভিন্ন লোকজ বিষয় ও নানারকম নকশা দিয়ে সরা আঁকা হয়। এসব সরা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে সাজসজ্জার কাজে ব্যবহার করা হয় এবং গৃহসজ্জাতেও ব্যবহার করা হয়। তাই এসব সরাচিত্র আমাদের লোকসংস্কৃতির অংশ।

Read more